আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ফিলিস্তিন শাসন করেছেন তুরস্কের উসমানীয় সুলতানরা। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে মামলুকদের পরাজিত করে উসমানীয়রা পবিত্র এই ভূমির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। সুলতান সেলিম যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তিনি ২৯ ডিসেম্বর ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমে পদার্পণ করেন।

এরপর ৮ ডিসেম্বর ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৪০১ বছর ফিলিস্তিন উসমানীয়দের শাসনাধীন ছিল।

উসমানীয়রা ফিলিস্তিনকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করেছিল। তা হলো জেরুজালেম, গাজা ও নাবলুস। উসমানীয় শাসনামলের পুরো সময়ে শাসকরা ফিলিস্তিন ভূমিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং পবিত্র এই ভূমি রক্ষার জন্য তাঁরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যান।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা ফিলিস্তিন রক্ষায় ব্যর্থ হন। যুদ্ধের শুরু থেকেই ব্রিটিশ বাহিনী জেরুজালেমকে লক্ষ্যে পরিণত করে। ১৯১৭ সালের মার্চ ও এপ্রিলে পরিচালিত ব্রিটিশ বাহিনীর প্রথম দুটি আক্রমণ উসমানীয়রা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিহত করে। এরপর ব্রিটিশ সেনাপ্রধান অভিজ্ঞ ও ধূর্ত কমান্ডার অ্যাডমন্ড অ্যালেনবেকে জেরুজালেম অভিযানে নিযুক্ত করেন।

অন্যদিকে উসমানীয়রাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অধিনায়কদের ফিলিস্তিনে নিযুক্ত করে। যেমন : মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক, ফেজভি চকমাক, ইসমেত ইনোনু প্রমুখ। এ ছাড়া চানাক্কালে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে এমন সেনাদের ফিলিস্তিনে পাঠায়। পশ্চিমা বাহিনীর তুলনায় উসমানীয় বাহিনী জনবল ও অস্ত্রশস্ত্রে দুর্বল ছিল। পশ্চিমাদের অবিরাম যুদ্ধ তাদের আরো দুর্বল করে তুলেছিল।

সামরিক শক্তির দুর্বলতা ছাড়াও উসমানীয় বাহিনীর ভেতর আরো কিছু সমস্যা ছিল। যেমন : সেনা সমাবেশ কোথায় করা হবে সে বিষয়ে দ্বিধায় ভোগা, মিত্র জার্মান কমান্ডারদের সঙ্গে মতবিরোধ, অন্যান্য ফ্রন্টে পরাজয় মানসিক প্রভাব ইত্যাদি। অন্যদিকে জেনালের অ্যাডমন্ড অ্যালেনবের বাহিনী জেরুজালেমে প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ একই বছরের বড়দিনে জেরুজালেম দখলের নির্দেশ দেন।

উসমানীয়রা ভেবেছিল ব্রিটিশ বাহিনী গাজায় আক্রমণ করবে, কিন্তু তা না করে ৩১ অক্টোবর ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ বাহিনী বিরশিবা দখল করে। উসমানীয় বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করেও বিরশিবা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ বাহিনী গাজায় অবিরাম বোমা বর্ষণ করে এবং গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। তবে উসমানীয় সেনানায়ক রেফেত বেলে পাশা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ করে যান। ৬-৭ নভেম্বর উসমানীয়রা গাজা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ফলে ব্রিটিশদের জন্য জেরুজালেম বিজয়ের পথ খুলে যায়।

অ্যালেনবে উসমানীয় বাহিনীকে জেরুজালেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ না দিয়ে তাদের ওপর স্থল ও আকাশপথে তীব্র আক্রমণ শুরু করেন। উসমানীয়রা ক্ষুধা, রোগব্যাধি ও অস্ত্রশস্ত্রের স্বল্পতা এবং ব্রিটিশ বাহিনীর তীব্র বোমাবর্ষণের মুখেও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে, বিশেষত ৫৭ ও ৭৭তম রেজিমেন্ট অতুলনীয় বীরত্ব প্রদর্শন করে। তারা একটি সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও সক্ষম হয়। উসমানীয় বাহিনী ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রতিরোধ লাইন গড়ে তোলে। ফলে নভেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনী জেরুজালেমের নিকটবর্তী ইসমাইল পর্বত দখল করলে সামনে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হয়।

কিন্তু অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে উসমানীয়দের পরাজয়, রসদ স্বল্পতা এবং ব্রিটিশ বাহিনীর আগ্রাসনে পবিত্র এই শহর ধ্বংস হওয়ার ভয় ইত্যাদি কারণে শেষ পর্যন্ত জেরুজালেম থেকে উসমানীয় বাহিনী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে উসমানীয়রা জেরুজালেম ছেড়ে যায়। ৯ ডিসেম্বর শহরের মেয়র আল হুসাইনি ৬০তম ব্রিটিশ ডিভিশনের কমান্ডার শিয়ার কাছে শহরের চাবি ও নথিপত্র হস্তান্তর করেন।

যদিও উসমানীয়রা ব্রিটিশ আগ্রাসন ও বোমাবর্ষণে জেরুজালেম ধ্বংস হওয়ার ভয়ে স্বেচ্ছায় শহর ছেড়েছিল, তবু পশ্চিমারা এটা অসমাপ্ত ক্রুসেডের সমাপ্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছিল এবং অ্যালেনবেকে প্রথম ক্রুসেডে ফিলিস্তিন দখলকারী বুইলন গডফ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ১১ ডিসেম্বর অ্যালেনবে জাফা গেট দিয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। জেরুজালেম রক্ষার জন্য ৩১ অক্টোবর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৫ হাজার উসমানীয় সেনা শাহাদাতবরণ করেন। আল্লাহ তাদের আত্মত্যাগকে কবুল করে নিন। আমিন।